দিনে দিনে মাছের প্রাকৃতিক উৎস্যগুলো কমে যাওয়ায় আমাদের মাছের চাহিদা পূরণ হচ্ছে চাষের মাধ্যমে। ষাটের দশকে যেখানে ৯০ শতাংশ মাছ অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা হত, সেখানে আজ মাছ আহরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশে। এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় মাছের চাহিদা মেটাতে গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। যার কারনে বাংলাদেশে মাছ চাষের পরিমা্ন কয়েকগুণ বেড়েছে। এতে করে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশের মাথা পিছু মাছের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থ বছরে দেশে মাছের মোট উৎপাদন হয়েছে ৪৭.৫৯ লক্ষ মেট্রিক টন এবং দৈনিক মাথা পিছু মাছ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭.৮০ গ্রাম (উল্লেখ্য যে, একজন মানুষের দৈনিক মাথা পিছু মাছের আমিষের চাহিদা ৬০ গ্রাম)।
যেহেতু চাষের মাছই আমাদের অধিকাংশ চাহিদা মেটায়, সে মাছই আমাদের খেতে হয়, তাই আমরা চাই চাষের মাছটাও যেন হয় নিরাপদ। মাছ হবে সুস্বাদু, বাজে গন্ধমুক্ত, এন্টিবায়োটিকমুক্ত এবং ফরমালিন নামক বিষাক্ত প্রিজারভেটিভমুক্ত। প্রাকৃতিক মাছের মত স্বাদটা যদিও না পাই, তা যেনো অবশ্যই নিরাপদ মাছ হয় সেই আশা তো করতেই পারি। যদি সে মাছ উত্তম চাষ পদ্ধতি অনুসরন করে চাষ করা হয়, যদি ব্যবহার করা হয় গুনগত মানের পোনা, গুনগতমানের পানি, গুনগতমানের খাবার এবং এন্টিবায়োটিকের পরিবর্তে প্রোবায়োটিক তাহলেই আমরা তাকে নিরাপদ মাছ বলতে পারি।
আমরা কেবল আমাদের খাবারের কথা ভাবছি, নিরাপদ মাছের কথা ভাবছি, কিন্তু নিরাপদ মাছ পেতে হলে মাছের জন্য নিরাপদ খাবারের কথাটাওতো ভাবতে হবে। মাছের খাদ্যে যদি ভেজাল থাকে, আমদানী করা মাছের খাবারের উপকরণ (MBM–Meal & Bone Meal) বা অন্য আমিষ জাতীয় উপকরণের মধ্যে যদি ভারী ধাতব (Heavy metal) থাকে তাহলে নিরাপদ মাছ পাবো কিভাবে? ভালো মাছ চাইবো কিন্তু মাছকে খাওয়াবো পঁচা গম, পঁচা ভুট্টা, পঁচা বিস্কুট আর পঁচা ভাত। এত পঁচা পঁচা খাবার খাওয়া মাছ সুস্বাদু হবে কিভাবে? বাজারে যে প্যাকেটজাত মাছের খাবার বিক্রি হয় সেগুলোর সবই কি মান সম্পন্ন? অনেক ক্ষেত্রেই মাছের খাদ্য উৎপাদনে বিভিন্ন মেয়াদোত্তীর্ণ, নিষিদ্ধ উপকরণ বা মানুষ ও প্রাণীর দেহের জন্য ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় ৷ শুধু তাই নয়, অনেক খামারী মুরগি ও মাছ একই সঙ্গে চাষ করেন, জলাশয়ের উপরে মাচা দিয়ে বা পাশে মুরগি আর পুকুরে বা জলাশয়ে মাছ ৷ মুরগি বা হাসের বিষ্ঠা মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয় ৷ পোল্ট্রি লিটার, গোবর ব্যবহার করে চাষ করা মাছে শুধু বাজে গন্ধই না ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া যেমন E. coli, Salmonella এবং Campylobacter spp ইত্যাদিও থাকতে পারে। চাষের খরচ কমিয়ে মাছকে দ্রুত বড় করার জন্যই চাষিরা পোল্ট্রি লিটার, গোবর ইত্যাদি ব্যবহার করেন।
সাধারণত এক কেজি মাছ তৈরী করতে দুই কেজি খাদ্য লাগে, তাই চাষিরা উৎপাদন ব্যয় কমাতে মাছের জন্য সস্তা অনিরাপদ খাবার ব্যবহার করেন এবং নিজেদের অজান্তেই আমদের জন্য উৎপাদন করেন অনিরাপদ মাছ। মাছের জন্য নিরাপদ খাবারের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আমাদের খাদ্য আইন-২০১০ এ সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সেটা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে নিরাপদ মাছ পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেক কমে যায়। খাদ্য আইন-২০১০ অনুসরণের জন্য বেশী দরকার মনিটরিং জোরদার করা, মাঠ পর্যায়ে তাদারকি বাড়ানো, পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ বাড়ানো।পাশাপাশি, শুধু অধিক লাভের আশায় দ্রুত মাছ বড় করার জন্য নিষিদ্ধ দ্রব্য ব্যবহার না করার বিষয়ে চাষিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো।
অধিক উৎপাদনের জন্য এখন মাছের নির্দিষ্ট জাতকেও বিকৃতির কবলে ফেলা হচ্ছে। কৈ মাছ খাবেন, বাজারে নির্দিষ্ট জাতের কৈ মাছ কোথায়? সবই তো থাই-ভিয়েতনামী কই মাছের সঙ্কর জাত। দেশি শিং-মাগুর প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। আফ্রিকান মাগুরের সাথে সংকরায়নে উৎপাদিত দেশি শিং-মাগুর একটি বিকৃত জাতে পরিণত হয়েছে। মনোসেক্স তেলাপিয়া উৎপাদনে হ্যাচারীতে হরমোন ব্যবহার করে স্ত্রী মাছকে পুরুষ করা হয়, মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এসব আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ হতে সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দ্রুত ফলাফল পাবার আশায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাত্রায় হরমোন ব্যবহার করা। চাষিরা বলেন আমদানী করা হরমোনে ভেজালের কথা, ভেজালের কারনে নাকি তাদেরকে অতিমাত্রায় হরমোন ব্যবহার করতে হয়। হরমোন এর মাত্রা সঠিক না হলে বা ওই হরমোন পুরোপুরি শোষিত হওয়ার আগেই যদি বাজারে মাছ বিক্রি করা হয় তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হবে৷
আসলে মাছের গুণগতমান নিশ্চিত করার জন্য এবং ভোক্তা সাধারণের কাছে নিরাপদ মাছ পৌঁছে দেয়ার জন্য উত্তম মৎস্যচাষ অনুশীলনের বিকল্প নেই। মাছ চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নিয়মগুলিই উত্তম মৎস্যচাষ অনুশীলন। এ নিয়মগুলো অর্থাৎ সঠিকভাবে খামার ব্যবস্থাপনা করে, গুনগতমানের পোনা ব্যবহার করে, খাদ্য ও পানির গুনাগুন ঠিক রেখে, মাছ ও চিংড়ি আহরণ ও আহরনোত্তর সঠিক পরিচর্যা করে এবং সঠিকভাবে পরিবহন করেই শুধু আমরা সুস্বাদু নিরাপদ মাছ পেতে পারি।
তবে সুস্বাদু নিরাপদ মাছ পেতে হলে আরো কিছু বিষয় যেমন, মাছ ধরার পর থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত ফড়িয়া, পাইকার, আড়তদার এবং আরো অনেকগুলো হাত বদলের বিষয়, বরফায়িত করা, প্যাকেজিং এবং প্রসেসিং ইত্যাদি বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
(চলবেঃ মৎস্য আহরণ, আহরণোত্তর পরিচর্যা, প্যাকেজিং ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানো বিষয়ের লেখা নিয়ে পরের পর্ব)
মোঃ মাকসুদুর রহমান
কৃষি উৎপাদন, সরবরাহ শিকল ও নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ।
ই-মেইলঃ maksudurrahman1363@gmail.com