শেখ শামছুর রহমান এবং আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা।
——————————————
পুণ্যভূমি সাবেক যশোর ও বর্তমান মাগুরা জেলার বহমান চিত্রা নদী মধুমতি ও নবগঙ্গার অববাহিকায় যে শিক্ষিত সচেতন ও আধুনিক সভ্য সমাজ গড়ে উঠেছে তার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও রূপকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সর্বজনাব প্রয়াত শেখ শামছুর রহমান। তিনি মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার ঘোষগাতি নিবাসী মরহুম সাহিত্যরত্ন কবি শেখ হবিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র। সাহসী সুদর্শন প্রগতিশীল বৈপ্লবিক আদর্শের প্রতীক, আজন্ম নির্মোহ জ্ঞান তাপস অনন্য মেধাবী সেই সাথে নিরলস অধ্যবসায়ী ও বিদ্যা- শিক্ষাদানে সক্রেটিস তুল্য এই মহান ব্যক্তিত্ব মৃত্যুর পরেও চিরঅম্লান হয়ে আছেন এবং থাকবেন আমাদের মাঝে। এমন বাস্তবমুখী কর্ম ও স্বপ্ন দ্রষ্টা সমগ্র দেশে আজও বিরল।
আত্মত্যাগী সর্বত্যাগী এমন বিশ্বকর্মা ক্ষণজন্মা মানুষ সত্যিই আজকের সমাজে খুবই বিরল। তিনি তো আমৃত্যু ভালোবেসেছেন মা মাটি মানুষকে। তাই কখনো তিনি তার জন্মস্থান ছেড়ে যাননি। প্রয়োজনে কখনো কোথাও গেলেও আবার মা মাটির টানে ফিরে এসেছেন বহমান চিত্রার তীরে আপন নীড়ে। অনেকে বলেন শেখ শামছুর রহমান চাইলে কিনা হতে পারতেন? বড় ডাক্তার বড় ইঞ্জিনিয়ার ব্যারিস্টার বিচারপতি ডিসি সেক্রেটারি এমনকি বড় বড় রাজনৈতিক দলের সরকারের এমপি মন্ত্রী আরো কত কি। বাস্তবে তিনি ওরকম কিছু না হলেও ওই মাপের ও মানের অসংখ্য মানুষ তিনি তৈরি করে গেছেন। গবেষণা করলে অন্তর খুলে দেখলে উপলব্ধিতে আসে সত্যিই তিনি পার্থিব জগতে এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি এমন বড় বড় পদ-পদবীর শত শত মানুষ তৈরি করেছেন। তাঁর কখনো এসবের জন্য লোভ বা মোহ ছিলো না।
তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিয়তাবাদী সার্বজনীন সাম্যবাদের অনন্য দিকপাল সর্বহারা মানুষের মুক্তির দিশারী। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন সাম্যের আলোকে শ্রেণী বৈষম্যহীন এক নতুন দেশ জাতি বিনির্মাণের অন্যতম রূপকার সৈনিক। ইতিহাসে যেটা দেখা যায় ১৯ শতকের গোড়ার দিকে এই মধুমতি চিত্রা নবগঙ্গার অববাহিকায় বসবাসরত যে সভ্যতা ছিল একেবারেই শিক্ষা দীক্ষা হীন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ। ঠিক সেই সমাজে এক বনেদি – প্রখ্যাত গুরু -পন্ডিত- কবি পরিবারে শেখ শামছুর রহমানের জন্ম ১৯৩৩ সালে। জন্মসূত্রেই তিনি এই শিক্ষিত পরিবার থেকে আদর্শ শিক্ষার আলো পেয়েছেন। আজীবন তিনি ছিলেন শিক্ষা অনুরাগী। লেখাপড়া আর জ্ঞান বিদ্যা অর্জনই ছিল তার একমাত্র সাধনা। অতঃপর তিনি সপ্তম শ্রেণী হতে বাবার কর্মস্থল কলকাতা হওয়ায় বড় ভাই মাহবুবুর রহমান সহ দুই সহোদর কলকাতা রিপন কলেজিয়েট স্কুলে ৭ম ও ৮ম শ্রেণীর এপ্রিল পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পেরেছেন। অতঃপর হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার কারণে আবার ফিরে আসতে হয় নবগঙ্গার তীরে গঙ্গারামপুর পিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আর সেই মুহূর্তেই তার জীবনে বড় এক মানবতা ও মনোজগতের পরিবর্তন এসে যায়।
১৯৪৩-৪৪ সালে স্বচক্ষে তিনি দেখেছেন রায়ত-দাঙ্গা অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম দন্দ্ব যুদ্ধ। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় মুসলিমকে নিধন করা হচ্ছে অপারপক্ষে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় হিন্দু নিধন করা হচ্ছে। এই কৈশোর জীবনে এমন নির্মম অকল্পনীয় অমানবিক দৃশ্য তিনি দেখলেন-যে মানুষ মানুষকে ভিন্ন জাত ও ধর্মের দ্বন্দ্বে এভাবে হত্যা করতে পারে? তার হৃদয়ে একটা বড় রকমের নাড়া দেয়। তখন তিনি গভীর ভাবনা চিন্তা চেতনা ভেতর দিয়ে লেখাপড়া করতে থাকেন। যদি মানুষের মাঝে এই সাম্প্রদায়িকতা না থাকে এই দ্বন্দ্ব না থাকে তাহলে মানুষকে মানুষ হত্যা করতে পারে না। দ্বিজাতি তত্ত্বের আলোকে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় যুদ্ধ কেবল রক্তই নিতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি সংখ্যালঘু জাতিকে নিঃশেষ করে দিতে পারে পৃথিবী থেকে। ১৯৪৩-৪৪ সালের এই চিত্রপট শেখ শামছূর রহমানের মানস পটে বড় দাগ কাটে । সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এত মানুষ মরলো স্বচক্ষে দেখলেন মানুষগুলোকে বাঁচাতে স্বর্গ হতে মা কালী ছুটে এলো না এবং শক্তিধর হযরত আলীও গম্বুজ থেকে ছুটে এলো না। একই রংয়ের রক্তের মানুষগুলো মরে একাকার হয়ে গেল।
শেখ শামছুর রহমান মনে প্রাণে বিশ্ব শান্তি ও মানবতার দর্শন ধারণ করেছেন এবং সেভাবেই তিনি জীবন যাপন করেছেন । তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপে অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্ম নিরপেক্ষ ( যার যার ধর্ম তার তার থাকবে)। বড় গর্বের বিষয় তিনি কখনো কারো কাছে মাথা নত করেননি কোথাও আত্মসমর্পণ করেননি । দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এবং এক বিশ্ব এক সূর্য মানবতাবাদী সার্বজনীন মানব জাতি এই দর্শন নিয়েই তিনি মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবিচল অনড় ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের এই দাঙ্গা মুহূর্তে তিনি আবার ফিরে আসেন নব গঙ্গার তীরে গঙ্গারামপুর পিকে মাধ্যমিক স্কুলে।
তিনি বরাবরই গণিত বিষয়ে তুখোড় ছিলেন । তিনি গণিত বিষয়ে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ১০০তে ১০০ নম্বর পেয়েছেন আমাদের ক্লাসে বহুবার সে গল্প করেছেন। আমরা বড় উৎসাহিত হয়েছি। তিনি অকল্পনীয় মেধাবী ছিলেন, সেই আমলে ১৯৫০ সালে একমাত্র ঢাকা বোর্ডের অন্তর্গত মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন যা ছিল বড় দুর্লভ ও ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। অতঃপর বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৫৫তে বিএসসি গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রী অর্জন করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন একজন নির্মৌহ জ্ঞান তাপস। ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশে ঐতিহাসিক ছাত্র সংগঠন বলতে অনুশীলন এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন এর আলোর ছোয়া তিনি পেয়েছিলেন।
১৯৪৭ এ দেশ বিভাগের মুহূর্তেও জমিদার প্রথা বিদ্যমান। শুরু হয় তেভাগা আন্দোলন। পাকিস্তান পিরিয়ড শুরুর মুহূর্তেই কৃষকদের তে- ভাগা আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। তে-ভাগা আন্দোলনে জমিদাররা হঠাৎ আইন করলো ফসলের তিন ভাগ তাদের দিতে হবে আর একভাগ কৃষক পাবে কৃষক তা মানতে রাজি নয়। এ আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল রাজশাহী দিনাজপুর এলাকার উপজাতি গারো সম্প্রদায় এলাকাতে। তাদের শক্তিশালী বিপ্লবী সরদার ছিল মাতলা মাঝি। সম্পূর্ণ আন্দোলনের নেপথ্যে আন্ডারগ্রাউন্ডের নায়ক ছিলেন ইলা মিত্র। জমিদার বংশের কন্যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন। জমিদারের কন্যা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আজীবন লড়াই সংগ্রাম করেছেন সংখ্যালঘু উপজাতি কৃষক শ্রমিকের মুক্তি ও অধিকার নিয়ে। “ইলা মিত্র নারী আইন করলেন জারি” উপমহাদেশে তেভাগা আন্দোলনের এই স্লোগান বড় ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক জীবনে এসে ইলা মিত্রের সাথে শেখ শামছুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের দর্শনগত সাক্ষাৎ হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তথা মাতৃভাষার প্রতি তার ছিল গভীর ভালোবাসা তিনি আজীবন পরিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলেছেন। তার স্কুল শিক্ষাকতা ও জীবদ্দশায় অত্র বিদ্যালয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ ভাষা সৈনিকদের স্লোগান মুখরিত প্রভাতফেরি অব্যাহত ছিল।
সুদর্শন সুশিক্ষিত এই তরুণ যুবক মাত্র ২২ বছর বয়সে চিত্রা নদীর পূর্ব তীরে পুলুম নামক গ্রামে শহীদ খন্দকার আব্দুল মোতালেবের প্রাণপন সংগ্রামে স্থাপিত হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ অলংকৃত করেন। শুরু হলো শিক্ষকতার পথ চলা। মানুষ তৈরি করার কারিগর তিনি। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক এবং আজীবন তিনি এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন (২০০০ সাল অবধি)। বৃহত্তর যশোরের মাঝে বেসরকারি হিসেবে অত্র বিদ্যালয়টি লেখাপড়া খেলাধুলা সাংস্কৃতিক সার্বিক বিষয়ে অন্যতম প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যথেষ্ট পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করে। গর্বের বিষয় তিনি একাধিকবার যশোর শিক্ষা বোর্ডের হেড এক্সামিনার হয়েছেন এবং মাগুরা জেলার শ্রেষ্ঠ্য শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন।
এরপরে তার জীবনে ঘটে যায় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ঐতিহাসিক বৈপ্লবিক স্মৃতিময় ঘটনা। উল্লেখ্য তৎকালে যারা মেধাবী তারাই রাজনীতি করতেন তারাই দেশ শাসন করতেন। কেবলমাত্র মেধাবী দেশপ্রেমীক সুশাসকেরাই পারে দেশকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করতে ও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। ভারত উপমহাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ কৃষক শ্রমিক দুঃখী দরিদ্র। তাদের মুখে হাসি ফোটানো তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করাটাই শেখ শামছুর রহমানের রাজনীতির উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ালো। তিনি দুনিয়ার তামাম শ্রমিক কৃষকের মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত হলেন এবং তাদের বেঁচে থাকার সকল মৌলিক অধিকার অর্জনের শপথ নিলেন। তিনি দেখলেন এবং উপলব্ধি করলেন শুধু ভারত বর্ষ নয়, গোটা পৃথিবীতে বুর্জোয়া শ্রেণীর লুটেরা শাসন শোষণ নিপীড়ন করছে এই প্রলেতারিয়েত জনগোষ্ঠীকে। এদের মুক্তির সংগ্রামে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজতান্ত্রিক নেতা পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কমরেড আব্দুল হকের সান্নিধ্যে চলে যান গোপন রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং সংগঠনের সদস্য পদ অর্জন করেন (পাকিস্তানি আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন আমলে)। এর জন্য তাকে গ্রামেগঞ্জে মাঠে জনসম্মুখের অন্তরালে অন্ধকারে দিন রাত কাটাতে হয়েছে কাজ করতে হয়েছে। শপথ একটাই শ্রমিক কৃষক শ্রেণীর মুক্তি মুক্তি আর মুক্তি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দর্শনগতভাবে মানতে পারেননি। তার সংগঠনটি চীনার ভাবাদর্শে এগিয়ে চলছিল। যুদ্ধটাকে তারা মনে করেছিল এটা বাংলাদেশের মুক্তির যুদ্ধ নয়, এটা হচ্ছে রাশিয়া-আমেরিকা দুই কুকুরের লড়াই । বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও কোনো না কোনো বলয়ে চলে যাবে অনেকটা পরবর্তী তাই দেখা গেছে আমেরিকার তাবেদার বলয়ে বাংলাদেশ আজও চলছে। পৃথিবী সৃষ্টি হতে অদ্যবধি যারা জোরদার মহাজন শাসক পেটি বুর্জোয়া বুর্জোয়া ক্যাপিটালিস্ট তারাই নিপীড়িত প্রলেতাড়িয়েত জনজাতিকে শাসন শোষণ ও নিষ্পেষিত করে চলছে। এই শাসন শোষন বর্জুয়ার বিরুদ্ধে ছিল শেখ শামছুর রহমানের আজীবন লড়াই সংগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বুর্জোয়া ক্যাপিটালিস্টরা তাদের শোষণ কৌশল পাল্টায়- স্বশরীরে কোন দেশকে তারা শাসন শোষণ করে না । অতঃপর তারা নয়া কলোনি বা নয়া উপনিবেশিকতার ভিতর দিয়ে প্রোপাগান্ডা সৃষ্টি করে পৃথিবীর দুর্বল অর্থহীন গরিব দেশগুলোকে অবলীলায় পারমাণবিক অস্ত্রে ঋণে শাসনে কৌশলে শোষণ করে চলছে। লুটেরা- বুর্জুয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে এই দুনিয়ায় শ্রমিক কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জন করেছে তার অসংখ্য নজির আছে।
প্রয়াত শেখ শামছুর রহমানের স্বপ্ন কল্পনা এমনটি ছিল তার রাজনৈতিক জীবন ও দর্শন পর্যালোচনা করলে পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করা যায়। তিনি হয়তো কোন জাতি রাষ্ট্রকে এভাবে শ্রেণী সংগ্রাম করে মুক্তি এনে দিতে পারেননি কিন্তু তার কর্ম চেষ্টা ভাবনা সংগ্রাম আমৃত্যু অব্যাহত ছিল। সে সময় তার চারপাশের মানুষগুলো তথাকথিত এ দল-ওদল সেদল বিভিন্ন প্রতীক নিয়ে আমজনতার মাঝে ভোট ব্যালট যুদ্ধে কামড়াকামড়ি করছে- তিনি কিন্তু সুস্থ মস্তিষ্কে তার ভাবনা থেকে সর্বহারা শ্রেণীর মুক্তির সংগ্রাম থেকে কখনো পিছপা হননি বরং আমরণ লড়ে গেছেন।
ভিয়েতনামের স্বাধীনতার সংগ্রামের মুক্তির পুরোধা হোচি মিন। ১৯৩৩ সাল থেকে যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭৪-৭৫ এর দিকে ভিয়েতনাম মুক্তি পায় ব্রিটিশ ওলন্দাজ অবশেষে আমেরিকার দাসত্ব থেকে। কয়েকশ বছর ব্রিটিশ শাসন থেকে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্রপতি নেলসান ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে অবশেষে নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষ গুলো স্বাধীনতা লাভ করে এবং শ্বেতাঙ্গদের শোষণ থেকে বের হয়ে আসে। ম্যান্ডেলা ২৭ বছর জেল খেটেছেন তবু সংগ্রাম থেকে পিছপা হননি। ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক বৈপ্লবিক সৈনিক চে গুয়েভারা ল্যাটিন আমেরিকার রাজ প্রথা ও বংশ তান্ত্রিক শাসন শোষণ থেকে প্রায় ১৬ টি দেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা এনে দেয়। অবশেষে যার নেতৃত্বে আমেরিকার খুব কাছের দেশ কিউবার স্বাধীনতা অর্জন করেন তার বন্ধু কিউবার রাষ্ট্রনায়ক ও সহযোদ্ধা ফিদেল কাস্ট্র দুজনে। বিপ্লবের প্রতীক চে গুয়েভারা এখনো বিশ্ব তরুণের বুকে বিপ্লবের সাইনবোর্ড হয়ে বেঁচে আছেন। শেখ শামছুর রহমান এমন সব সংগ্রামী নায়কদের দার্শনিক আনুগত্য তিনি পেয়েছিলেন। ১৯১৭ সালে জার রাজবংশের পতন ঘটিয়ে ভ্লাদিমির এলিচ লেনিন রাশিয়াতে ক্ষমতা আসেন প্রলেতারিয়েত শ্রমিকের শ্রেণীর নায়ক মস্কো দুনিয়ার মুক্তির দিকপাল।
পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন অন্যতম সংগঠক হিসেবে শেখ শামছুর রহমান নিরলস কাজ করেন। এ সময় উপমহাদেশের বাঘা বাঘা বিপ্লবী নেতাদের সান্নিধ্য পান তাদের অন্যতম প্রধান কমরেড আব্দুল হক, অমল সেন, আব্দুল লতিফ, আনহু আব্দুর রাজ্জাক, তেভাগা আন্দোলনের (যাবজ্জীবন জেল মুক্তির পর) নেতৃদ্বয় কমরেড নুর জালাল ও কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সি ও আরো অনেকের। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পর তার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং সকল নেতারা আন্ডারগ্রাউন্ড চলে যায়। তার জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে লোক চক্ষুর অন্তরালে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে। এর মাঝে অনেকদিন তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন রাজনীতিতে ।
অতঃপর ১৯৮০র দশকে চলে আসেন সশস্ত্র বিপ্লব থেকে বের হয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভেতর দিয়ে লড়াই সংগ্রাম করে কিভাবে প্রকাশ্যে সাম্য সমঅধিকার রাজনীতির আলোকে মেহনতী মানুষের মুক্তি আনা যায়। সেই লক্ষ্য আদর্শে মন স্থির করে তিনি চলে আসেন মস্কোপন্থীর ভাবাদর্শে প্রকাশ্যে বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে অর্থাৎ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণকারী ও অন্যতম অংশীদারিত্ব রাজনৈতিক পার্টি সিপিবি তে। এ সময় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমরেড মণি সিংহ কমরেড ফরহাদ হোসেন হেনা দাস রতন সেন সুনীল রায় অজয় রায় সাইফুদ্দিন মানিক মনজুরুল হাসান খান মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কেশোরী মোহন চ্যাটার্জী শহীদুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখের সাথে সাক্ষাৎ হয়।
তিনি দীর্ঘ বছর মাগুরা জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং নিষ্ঠার সাথে কাজ করে গেছেন। সংবাদ এবং একতা পত্রিকা নিয়মিত পড়তেন। আজ এই বিশ্বে পারমাণবিক আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে আমরা দেখতে পাই লুটেরা বুর্জোয়া ক্যাপিটালিস্টদের শাসন শোষণ প্রোপাগান্ডা আধিপত্য বিস্তারকারি আমেরিকা ও তার সহযোগী দোসররা বিশ্বের গরিব দেশগুলিকে পরিকল্পিতভাবে দখলদারিত্ব শাসন নিপীড়ন নিষ্পেষণ এবং খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন করছে। অপারপক্ষে এই বিশ্বে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে – রাশিয়া চায়না কিউবা ভিয়েতনাম সহ অনেক দেশ জাতি।
শেখ শামছুর রহমান হয়তো আজকের দুনিয়ায় মাও সেতুং, লেনিন, ফিদেল ক্যাস্ট্র, স্টালিন, হোচিমিন, নেলসান ম্যান্ডেলা, জ্যোতি বসু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র, ভাগত সিং, সূর্য সেন প্রমুখের ন্যায় দেশ জাতির মুক্তি শাসক ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী বৈপ্লবিক সৈনিক হতে না পারলেও অন্তত গরিব এই বাংলাদেশের একটি অবহেলিত পিছনে পড়া কুসংস্কারাচ্ছন্ন জনগোষ্ঠীকে আদর্শ শিক্ষার আলো মানবতা ভালোবাসা দিয়ে নিজেকে মূল্যবোধ সম্পন্ন মুক্ত চিন্তার মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। তার এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তমূলক কর্ম আমাদের হৃদয় পটে চির অম্লান। আপনার সৃষ্টিশীল জৈব চৈতন্য দ্বারাই লক্ষ্য অর্জনের পথে মুক্ত হবে সামাজিক অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থেকে, নিপীড়ন বিভেদ ও বৈষম্য থেকে। সত্য সাম্য মৈত্রী প্রেম ভালবাসার আলোকে নতুন আঙিকে গড়ে উঠবে আপনার স্বপ্নের এক নতুন বিশ্ব।
স্যালুট স্যার শেখ শামছুর রহমান। চির কামনা
আপনি যেখানেই আছেন ভালো থাকবেন।
বি: দ্র: প্রয়াত শেখ শামছুর রহমান স্যারের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ও বাংলাদেশের বীর ভাষা সৈনিকদের মৃত্যু দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৫ এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে তাঁর স্মরণে লেখা। ভুল- ত্রুটি মার্জনীয়।
মোয়াজ্জেম হোসেন — এসএসসি ১৯৯০ ব্যাচ
পুলুম গোলাম ছরোয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
চির অম্লান-
প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক প্রয়াত শেখ শামছুর রহমান।
সংকলনেঃ দৈনিক আলোকবর্তিকা।
Leave a Reply